বালুচরী কে বাহবা দেয় জগত, উজ্জ্বল হল বাংলার মুখ

"বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি
তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর"
কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখে যদি এমনটা বলতে পারেন, তাহলে নিশ্চয়ই বাংলার নারীকূল বাংলার শাড়ি দেখেও একথা বলতে পারেন, তাই না?
            তাঁত, জামদানি, মসলিনের পাশাপাশি বালুচরীও সমান ভাবে বাংলার মান রাখতে সক্ষম। কাজেই তারও যে কালেকশন আলমারিতে রাখা দরকারি, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। 
              কেমন ছিল এই বালুচরীর জন্মের ইতিহাস, কেমনই বা তার নকশা, কেমন দাম হাঁকতে পারে, চলুন জেনে নেওয়া যাক বিস্তারিত।
  
ইতিহাস:
বালুচরীর জন্ম মুর্শিদাবাদ জেলার জিয়াগঞ্জের নিকটবর্তী অধুনালুপ্ত বালুচর নামক স্থানে। বালুচরের সঠিক অবস্থান নিয়ে নানান মতভেদ আছে। ভারত পথিক যদুনাথ সর্বাধিকারী তার ১৮৫৭ সালে রচিত ভ্রমণ বৃত্তান্তে জিয়াগঞ্জ শহরে বালুচর বলে একটি অঞ্চলের কথা উল্লেখ করেছেন যা চেলি ও গরদের আড়ত বলে বিখ্যাত ছিল। মুর্শিদাবাদ জেলার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও রেশমশিল্প গবেষক নিত্যগোপাল মুখোপাধ্যায়ের মতে বহরমপুরের কয়েক মাইল উত্তরে ভাগীরথীর তীরে বালুচর অবস্থিত। ঐতিহাসিক বিনয় ঘোষের মতে জিয়াগঞ্জের বালুচর ছিল রেশমশিল্পজাত নানা প্রকার বস্ত্রাদির বড়ো আড়ত ও ব্যবসা কেন্দ্র। তাঁতশিল্পীদের বসতি ছিল জিয়াগঞ্জের নিকটবর্তী বাহাদুরপুর, বেলিয়াপুকুর, রামডহর, রমনাপাড়া, রণসাগর, আমডহর, বাগডহর, আমাইপাড়া প্রভৃতি গ্রামসমূহে।তাঁরা তাদের রেশমের শাড়ি জিয়াগঞ্জের বালুচরে বিক্রি করতেন। বিক্রয় কেন্দ্রের নামেই শাড়ীর নাম হয় বালুচরী।লোকসংস্কৃতি গবেষক ডঃ সোমনাথ ভট্টাচার্যের মতে বালুচরীর উদ্ভব বালুচর অঞ্চলের নিকটবর্তী মীরপুর-বাহাদুরপুর গ্রামে।
       বালুচরীর জন্মকাল অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে।অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বর্তমান এপার বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার আজিমগঞ্জ-জিয়াগঞ্জ অঞ্চলে গড়ে ওঠে এই শাড়ির বাণিজ্যকেন্দ্র। দূরদূরান্ত থেকে মারোয়ারী, গুজরাতী, পঞ্জাবী, আর্মানী, ইহুদী, ইংরাজ, ফরাসী ও ওলন্দাজ বণিকরা বাণিজ্যের জন্য আসতে থাকেন এই অঞ্চলে। কিছু ঐতিহাসিক মত অনুসারে সেই সময় গুজরাতী তাঁতীদেরও আগমন হয়, এবং তার ফলেই ভাগীরথীর পূর্ব পাড়ে বালুচরে গড়ে ওঠে বয়নশিল্প। আবার কিছু ঐতিহাসিক মতানুযায়ী মুর্শিদ কুলি খাঁ ১৭০৪ সালে সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মকসুদাবাদে স্থানান্তরিত করার পর তার বেগমদের জন্য নতুন শাড়ি তৈরীর হুকুম দেন বালুচরের তাঁতশিল্পীদের। তারা যে নতুন শাড়ি সৃষ্টি করেন তাই বালুচরী নামে খ্যাত হয়।
                 নবাব মুর্শিদকুলি খানের উদ্যোগে সেখানে বালুচরী শাড়ির রমরমা দেখা দেয়৷ সেখানে এই শিল্পের শেষ বিখ্যাত কারিগর দুবরাজ দাস মারা যান ১৯০৩ সালে, তিনি চিত্রশিল্পীদের মত শাড়িতে নিজের নাম সই করতেন৷গঙ্গার বন্যায় এই গ্রাম বিধ্বস্ত হলে শিল্পীরা আশ্রয় নেন বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে৷ সেখানে মল্ল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই শিল্পের সমৃদ্ধি ঘটে৷ মল্ল রাজাদের সময়ে নির্মিত টেরাকোটার মন্দির ও অন্যান্য শিল্পের প্রভাব পড়ে এই শাড়ির নকশায়৷ পরে ব্রিটিশ জমানায় অন্যান্য দেশীয় বয়নশিল্পের মত বালুচরীও দুর্দশাগ্রস্ত হয়৷ ১৯৫৬ সালে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সুভো ঠাকুর বা সুভগেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে এই শাড়ির বাণিজ্যিক বিস্তার ঘটে৷ তিনি তখনকার বিখ্যাত কারিগর অক্ষয়কুমার দাসকে রিজিওনাল ডিজাইন সেন্টারে (সুভো ঠাকুর এর ডিরেক্টর ছিলেন) সাবেক জালা তাঁতের পরিবর্তে জ্যাকার্ড তাঁতের ব্যবহার শেখান৷ পরের বছর অক্ষয় দাস অজন্তা-ইলোরার মোটিফ লাগিয়ে নতুন বালুচরী বাজারে আনলে এই শিল্পের উত্থান ঘটে৷
দেহসৌষ্ঠব:
বালুচরী দৈর্ঘ্যে ১৫ ফুট ও প্রস্থে ৪২ ইঞ্চি । আঁচলের দৈর্ঘ্য ২৪ থেকে ৩২ ইঞ্চি।গবেষিকা চিত্রা দেব বালুচরীর অলংকরণকে চার ভাগে ভাগ করেছেন, যথা চিত্র, কল্কা, পাড় ও বুটি। তার মতে চিত্র অংশের নকশিকাঁথা শুধুমাত্র এই শাড়ি তেই দেখা যায়। 

বৈচিত্র্য:
রেশম বালুচরীতে নিত্য নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে তৈরি হয়েছে নিত্যনতুন শাড়ি৷ এক বা দুই রঙের সাধারণ বালুচরী, রঙে ঝলমল মীনাকরী বালুচরী, গুরুদাস লক্ষ্মণ আবিষ্কৃত স্বর্ণচরী, অমিতাভ পালের সৃষ্টি রূপশালি ও মধুমালতী, অমিত লক্ষ্মণের সৃষ্টি দ্রৌপদী বালুচরী (মহাভারত টিভি সিরিয়ালের দ্রৌপদীর সাজসজ্জার অনুকরণে) ইত্যাদি।

বুনন ও কৌশল প্রক্রিয়া:
এই শাড়ি মূলতঃ রেশমের শাড়ি। যদিও পরে তুলো থেকে তাঁতের বালুচরী ও আজকাল বাঁশ, কলা ইত্যাদি গাছ থেকে পাওয়া সুতো থেকে জৈব বালুচরীও বানানো হয়েছে৷ একটা শাড়ি বানাতে দুজন কারিগরের এক সপ্তাহ বা বেশি সময় লাগে৷ প্রথমে গুটিপোকা থেকে রেশম সংগৃহীত হয়, পরে তা সোডা ও গরম জলে সেদ্ধ করা হয় ও অ্যাসিড রঙে ডোবানো হয়৷ তারপর দুদিক ধরে টেনে টানটান করা হয়, যাতে সুতো দিয়ে কাপড় বোনা যায়৷ শাড়ির নকশাগুলি কাগজে এঁকে পাঞ্চিং কার্ডের সাহায্যে শাড়িতে বসিয়ে দেওয়া হয়৷ আজকাল পরিবেশবান্ধব নানা জৈব রঙও ব্যবহৃত হচ্ছে৷
দাম:
বালুচরী শাড়ি তার অনন্য সাধারণ ডিজাইনের জন্য অত্যন্ত বিখ্যাত। ভারতীয় মুদ্রায় বালুচরীর দাম কুড়ি হাজার টাকা থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত যেতে পারে। 

বালুচরীর ভবিষ্যত ও এপার বাংলা:
বাঁকুড়া জেলা ও আমাদের পশ্চিম বঙ্গ বালুচরী শাড়ির জন্য ভৌগোলিক নির্দেশক বা জি আই ট্যাগ ( জিওগ্রাফিক্যাল ইনডেক্স) লাভ করে।জাতীয় পুরস্কার, শিল্পমেলা ইত্যাদির কারণে বাংলা ও ভারতের বাইরেও এখন এই শাড়ির খ্যাতি ব্যাপ্ত৷ ২০১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লন্ডন সফরের সময় বিশ্ব বাংলা সংস্থার সহায়তায় ব্রিটেন ও জাপানের বাজারে লরা অ্যাশলির দোকানে বালুচরী, শীতলপাটি ও অন্যান্য বঙ্গজ সামগ্রী বিক্রির জন্য রফতানি সংস্থা ওবিটি ও লরা অ্যাশলি কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হন।তাই এমনটা বলাই বাহুল্য বালুচরী শাড়ির বুনন সুদূর ভবিষ্যতে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় শিল্প।
                 শাড়ির জগতে বালুচরী যোগ করেছে এক নতুন ফ্যাশন সেন্স। কাজেই নিজেকে বালুচরীর সাজে সাজিয়ে বঙ্গতনয়া রূপে Bong swag নিয়ে ramp এ নামতেই পারেন। দীর্ঘায়িত হোক বাংলার সাধের বালুচরী শাড়ি।

Comments

  1. Suparna Bhattacharjee5 June 2023 at 22:55

    Khub valo hoyeche! darun darun❤️

    ReplyDelete
  2. Khuv e valo hoehche re keep it up 🥰❤️

    ReplyDelete
  3. দারুন দারুন ❤️

    ReplyDelete
  4. Sundor ❤️

    ReplyDelete
  5. বালুচরী শাড়ি সম্পর্কে জানার ইচ্ছেপূরণ হলো ❤

    ReplyDelete
  6. Khub shundor hoyeche maa❤❤❤

    ReplyDelete
  7. Valo hoye che

    ReplyDelete
  8. Excellent! Very much informative!

    ReplyDelete
  9. SWASTIKA BISWAS6 June 2023 at 07:44

    Very informative....keep it up🥰

    ReplyDelete
  10. Sundor❤️❤️

    ReplyDelete
  11. বালুচরীর ইতিবৃত্ত ভালো লাগলো। সুন্দর লেখা

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

পৈঠানীর তৈরি পান্ডুলিপি, জগৎজোড়া নাম তার

বেনারসির রূপকথা ,রূপকথার বেনারসি