কলমকারির কারুকার্যে যেন ভরে যায় মন
"A look in a saree is enough to slay"
সত্যিই তো। একদিন শাড়ি পরে বেশ কয়েকটি ফটো তুললে দশদিন মনটা খুশি খুশি থাকে। একেবারে হক কথা। "শাড়ি তে নারী" কি আর এমনি এমনি বলে!আলমারি খুললে দশ রকমের শাড়ি দাঁত কপাটি খুলে হাসবে, তাহলেই না নারী জীবনের সার্থকতা!
তা সে বেনারসি হোক, বা তাঁতই হোক, কিংবা মুগা সিল্ক। হোক না তা কাঞ্জিভরম,কলমকারি।
কলমকারির কালেকশন ও নেহাত মন্দ হয় না। কলমকারির কারুকার্যে এমনিতেই মন মজে যায়। তবে তার জন্য কলমকারি দেখতে কেমন, কী তার বৈশিষ্ট্য, কেমন করেই বা এলো, কতো দাম হাঁকতে পারে, জেনে নেওয়া তো দরকার নাকি! আসুন তবে জেনে নি বিস্তারিত।
ইতিহাস:
কলমকারি শাড়ির জন্ম সূদুর অন্ধ্রপ্রদেশ বা ইরানে। কলমকারি শব্দটির উৎপত্তি দুটি পারসিক শব্দের মিলনে, যথা- কলম( বা ঘলম) ও কারি অর্থাৎ কারিগরী। অর্থাৎ কলমের মাধ্যমে কারুকার্য করায় এর নাম কলমকারি।
দক্ষিণ ভারতে কলমকারির দুটি আঁতুড়ঘর- চেন্নাই থেকে ৮০ মাইল দূরে শ্রীকালহস্তী এবং হায়দ্রাবাদ থেকে পূর্বে ২০০ মাইল দূরে মাসুলিপটনম। স্বর্ণমুখী নদীর ধারে শ্রীকালহস্তী কলমকারির সৃষ্টি হয় আজ থেকে আনুমানিক ৫০০ বছর আগে বিজয়নগরে তুলুভ বংশের রাজা কৃষ্ণদেবরায়ের আমলে (১৪৭০-১৫২১ খ্রিস্টাব্দে)। বালোজা নামক চুড়ি প্রস্ততকারী গোষ্ঠী এ শিল্পকর্মের সাথে যুক্ত ছিল।
অন্যদিকে মাসুলিপটনমে কলমকারি গড়ে উঠেছে কৃষ্ণা জেলার পেডানা অঞ্চলে। গোলকোন্ডার সুলতানদের হাত ধরেই এই কলমকারির উৎপত্তি। স্বাভাবিকভাবেই মাসুলিপটনম কলমকারিতে আমরা দেখতে পাই পারসিক নকশা। এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছে তাঁতী সম্প্রদায়ের মানুষজন।
তাঞ্জোর এলাকায় মারাঠা যুগে রাজা সার্ফোজী ও শিবাজীর রাজত্বকালে এক নতুন ধরনের কলমকারির উদ্ভব হয়। রাজ রাজাদের পোশাকে ব্রোকেডের ওপর এই নতুন ধরনের কলমকারির নাম কারুর্পর শৈলী।
ব্রিটিশ রাজে সাহেবদের মন গলাতে কলমকারি শিল্পীরা বেশি করে ফুল, লতা, পাতা ফুটিয়ে তুলতেন। ওলন্দাজদের হাত ধরে পট বা পোশাক ছাড়িয়ে বিছানার চাদরেচাদরে কিংবা পর্দার কাপড়েও কলমকারি দেখা যেত।
বৈশিষ্ট্য:
কলমকারি ছবির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল তার রেখা। বেশিরভাগ নকশাই আঁকা হয় বক্ররেখায়। খুব প্রয়োজন ছাড়া সরলরেখার প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। সুর-অসুর, মানুষ সবারই মুখগুলো একটু গোল, চোখ বড় বড়, ঠোঁট একটু মোটা। ধনুকের মতো বাঁকা ভুরু আর চোখের মাঝেও থাকে আর একটি বক্ররেখা। নারী-পুরুষ উভয়ের গায়েই প্রচুর গয়না পরিলক্ষিত হয়। জামাকাপড়েও দেখা যায় নানান নক্সার কারুকাজ। ছবির বিষয় নারী-পুরুষ বা পশু পাখি, গাছপালা যাই হোক না কেন, বেশিরভাগ ছবিতেই পাওয়া যায় হরেকরকম ফুল। তা হয়তো দক্ষিণ-ভারতীয়দের পুষ্প-প্রীতির বহিঃপ্রকাশ। ছবির বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন আউটার ফ্রেমের প্রতি কমলকারি শিল্পীরা যথেষ্ট সতর্ক, সেটিও নকশা করা, যেন ছবিরই অংশ।
শাড়ি তৈরীর পদ্ধতি:
শ্রীকালহস্তী বা মাসুলিপাটনাম দু’জায়গাতেই কলমকারির ক্রিয়াকৌশল কিন্তু একইরকম। প্রথমে যে কাপড়টিতে কাজ করা হবে সেটি এক ঘণ্টা গরু বা মোষের দুধে ভেজানো হয় যাতে কাপড়ে রঙ না ছড়িয়ে পড়ে। তারপর বাঁশ ও খেজুরের কঞ্চির গায়ে সুতির কাপড় জড়িয়ে সুতো দিয়ে বেঁধে কলম তৈরি করা হয়। তারপর, কালো আউটলাইন আঁকা হয়। এই কালো রঙ বা কাসিমকারান তৈরি করা হয় লোহাচূড়, আখের গুড়, খেজুর গুড় জলে গুলে দশদিন ধরে পচিয়ে। তারপর সেই মিশ্রণটি ছেঁকে নিয়ে কলম দিয়ে আঁকা হয় রেখা। কখনো বা তেঁতুল গাছের ডাল ও কয়লা মিশিয়ে খসড়া আঁকার কালো রঙ তৈরি হয়। এই কালোরঙটি দীর্ঘস্থায়ী করা হয় মাইরোবালান ফুল (স্থানীয় ভাষায় কারাকাপুড্ডু) ও কুঁড়ির (কোরাকাপিণ্ডে) সাহায্যে। এরপর একে একে রঙ করার পালা। প্রথমে হাল্কা হলুদ, তারপর গাঢ় হলুদ, লাল, সবুজ, গোলাপী ও সবশেষে নীল রঙ ব্যবহার করা হয় । সবগুলি রঙ কিন্তু ভেষজ — নানান ফল, ফুল, লতা, পাতা থেকে সংগ্রহ করা। হাল্কা লাল তৈরি হয় বেদানার খোসা থেকে। হলুদ তৈরী হয় মাইরোবালান ফুল ও এ্যালাম গুঁড়ো করে জলে ফুটিয়ে। লাল রঙ তৈরি হয় চাতালাকোড়ি বা সুরুদুচেক্কা মূল থেকে। সবুজ রঙ পাওয়া যায় মাইরোবালান ফুল, কাসিমকারান ও এ্যালাম মিশিয়ে। গোলাপী রঙ চাডালাকোড়ি মূল থেকে বানানো হয়। নীল রঙ হয় তুঁত থেকে। উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করলেও শেষে কিন্তু আমরা দেখি অদ্ভূত নমনীয় একটা ম্যাট ফিনিশ।
শ্রীকালহস্তী শৈলীতে আছে জটিল সতেরোটি ধাপ। এক একটি সূক্ষ্ম ছবি করতে নয়-দশ মাসও লেগে যেতে পারে। কিন্তু মাসুলিপাটনাম ঘরানায় দেখা যায় বারোটি ধাপ। মাসুলিপাটনামে কাঠের ব্লকের সাহায্যে কাপড়ে প্রথমে লাল ও কালো অংশের ছাপ তোলা হয়। তারপর এই কালো ও লাল অংশগুলি কলমের সাহায্যে গলানো মোম দিয়ে সাবধানে ঢেকে দেওয়া হয়। এবারে কাপড়টি ঠাণ্ডা নীল রঙে ডোবানো হয়। কাপড়ের মোমে ঢাকা অংশে রঙ ধরে না। এরপর কাপড়টি শুকিয়ে নিয়ে গরম জলে দিয়ে মোম ছাড়িয়ে নেওয়া হয় এবং আবার শুকিয়ে সরাসরি হলুদ ও সবুজ রঙ করা হয়।
নকশা :
মূলতঃ মন্দির ও দেবদেবীকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে এই শাড়ির কারুকার্য। স্বাভাবিকভাবেই তাই ছবিগুলিতে ফুটে ওঠে রামায়ণ, মহাভারত, গীতা বা পুরাণের ছবি। এই ছবিগুলির বিষয় হিসাবে উঠে এসেছে — সপ্তাশ্বরথে সূর্যদেব, গীতার উপদেশপ্রদানরত শ্রীকৃষ্ণ, দেবী অণ্ডাল, সপরিবার নটরাজ, দশাবতার, দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় অর্জুন, রামসীতা, গোপী পরিবেষ্টিত শ্রীকৃষ্ণ, রুক্মিনী ও সত্যভামার সাথে শ্রীকৃষ্ণ, দোলায় রাধাকৃষ্ণ, চতুর্হস্তযুক্ত গণেশ, অষ্টহস্তযুক্ত মহিষাসুরমর্দিনী ইত্যাদি। এই ছবিগুলিতে সাধারণত দেব- দেবীকে আঁকা হয় লাল রঙে, দানবকে নীল ও সবুজ রঙে। নারী ফুটে ওঠে হলুদ রঙে। আর পটভূমি রচিত হয় লাল রঙে।
দাম:
কলমকারি শাড়ির কারুকার্য অত্যন্ত জটিল। জটিল এর তৈরীর পদ্ধতি। তাই নিঃসন্দেহে কলমকারি দাম যে সামান্য হলেও ঊর্ধমুখী হবে তা আন্দাজ করাই যায়। এক একটি শ্রীকালহস্তী কলমকারি ৫০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে(ভারতীয় মুদ্রায়)।আবার মাসুলিপটনম কলমকারির দাম ৩০০০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০০০ টাকা পর্যন্ত যায়(ভারতীয় মুদ্রায়)।
কলমকারি ও ভারতবর্ষ:
কলমকারির বিশ্বায়নে কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়ের অবদান অনস্বীকার্য। শ্রীকালহস্তী ঘরানার শ্রীরামাচান্দ্রাইয়া গিনেস বুক অফ রেকর্ডসেও স্থান করে নিয়েছেন। শ্রীকালহস্তীতে আজও প্রায় দেড়শজন শিল্পী নানান পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন সুপ্রাচীন এই শিল্পশৈলী। তাই বলা যায় সমগ্র বিশ্বেই কলমকারি সমাদৃত।
এভাবেই যুগ যুগ ধরে কলমকারির আঁচল বেয়ে চলে আসা ইতিহাস,শিল্পীর ভালোবাসা, তার ঐতিহ্য, সৌন্দর্য তাকে করে তুলেছে অনন্যসাধারণ, যা জগৎজোড়া সাফল্য আনতে সক্ষম হয়েছে। কাজেই ফ্যাশনের দুনিয়ায় এ যে এক অসাধারণ কৃতিত্বের দাবি রাখে তা বলাই বাহুল্য। কি বলেন, আসছে রথযাত্রায় সকলকে তাক লাগাতে কলমকারির সাজ হয়ে যাক?
Shundor
ReplyDeleteসেরা, অসাধারণ, দূর্দান্ত। অনেক কিছু জানলাম ❤️
ReplyDeleteAto Ki6u Hy Bhaa Bah valo laglo
ReplyDeleteঅসাধারন ❤️
ReplyDelete👌👍
ReplyDeleteKhub Shundor...😊❤️
ReplyDeleteKhub shundor ❤
ReplyDeleteKhub Shundor ❤️
ReplyDeleteOnek vlo laglo pore ✨
ReplyDeleteSundor hoye che lekha ta
ReplyDeleteBhalo ❤️
ReplyDeletekhub sundor❤️
ReplyDeleteBesh valo
ReplyDeleteঅসাধারণ, অজানা কে জানলাম
ReplyDeleteলেখা টা পরে মন ছুঁয়ে গেল, অনেক অনেক শুভকামনা রইল তোমার জন্য।
Darun ❤️
ReplyDelete❤️👌
ReplyDelete❤️❤️👍👍
ReplyDeleteWow
ReplyDeleteDaroon 👌🏻❤️
ReplyDeleteখুব সুন্দর❤️
ReplyDeleteখুব সুন্দর❤️ আমার জন্য একতা শাড়ি আনিস
ReplyDeleteKi likhechishh re...Darun👌👌
ReplyDeleteBah
ReplyDeleteMontaa taaja hoye gelo. Dhonnobaad, eidhoroner bishoyer opor lekhar jonno.
ReplyDeleteNice nice
ReplyDeleteKub sundor
ReplyDeleteDarun
ReplyDeleteKhub sundor
ReplyDeleteদেখেছি অনেক কলমকারী কাজ কিন্তু বুঝিনি এত পরিশ্রম আর সময় রয়েছে তার পিছনে। খুবই পরিশ্রমের কাজ। এই বিষয়ে আলোকপাত করার জন্য ধন্যবাদ
ReplyDeleteDarun lekha hoyechhe.
ReplyDeleteWow
ReplyDeleteBhaalo hoyechhe
ReplyDelete