জামদানিতে জমজমাট মেয়েবেলা,উঁকি দেয় গ্রামবাংলার ইতিউতি

শখে শখে জামদানী আর হরেক রকম ফুল
গোলাপ পোনা শাপলা জুঁই আর ছিটার গুটি ফুল।
বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু ও বাংলার ফলের পাশাপাশি বাংলার শাড়ি ও যে পুণ্যে ভরা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ঠিক এইজন্যই হয়তো মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নিতে বলা হয়েছে। মসলিন, তাঁত, জামদানি সবকিছুতেই মিশে আছে বাংলার সুবাস, বাংলার সংস্কৃতি। কোথাও বা শাড়ির আঁচলে সুতোর বুননে ফুটে উঠেছে আতপ চাল গোলা আলপনা। মায়ের আঁচল যেন হয়ে উঠেছে ছেলেবেলার মাটির উঠান। 
                 আজকের সারা পৃথিবীতে সাড়া ফেলে দেওয়া জামদানি শাড়িও এই বাংলার অপরূপ সৃষ্টি। কেমন ছিল তার জন্মবৃত্তান্ত? কেমন করে হয়ে উঠল তা বাংলার অনন্যা? কতোটা কড়ি ফেললে হাতে আসবে জামদানি? চলুন জেনে নেওয়া যাক বিস্তারিত।
 
ইতিহাস:
ফারসি শব্দ জামা এর অর্থ হল কাপড় এবং দানি শব্দের অর্থ হল বুটি। অর্থাৎ জামদানি শব্দের অর্থ বুটিদার কাপড়। বাংলার বস্ত্র জগতে মসলিনের পরেই নাম রয়েছে জামদানির। বুনন তাঁতে বুটি তোলা মসলিনের নাম হল জামদানি। বর্তমানে জামদানি শাড়ি একটি শৌখিনতার প্রতীক হিসেবে বর্তমান। জেমস টেলর তাঁর 'টপোগ্রাফি অব ঢাকা' গ্রন্থে বলেছেন, সম্ভবত মুসলিমরাই জামদানির বুনন অধিকতর প্রচলিত করেন(১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ)। মসলিনের পরেই জামদানির সুখ্যাতি ছিল বলেও কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। এমনটাও জানা যায় মসলিনের পরেই ছিল জামদানির সুখ্যাতি। ওয়াটসনের মতে, এই শাড়ির বুননের জন্যই মূলত শিল্পীরা দর হাঁকতেন। মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব ছিলেন জামদানি শাড়ির গুণগ্রাহী। তৎকালীন যুগে একটি জামদানি শাড়ির দাম ছিল ৩১ পাউন্ড। আমাদের এপার বাংলার নবাবরাও ছিলেন জামদানির পৃষ্ঠপোষক। শোনা যায়, বাংলার নবাব জাফর আলি খাঁ প্রতিবছর সম্রাট ঔরঙ্গজেবকে যে উপহার বা নজরানা পাঠাতেন তাতে একটি জামদানি শাড়ি থাকত। সেসময় একটি শাড়ির দাম ছিল প্রায় ৪৫০ টাকা। ঢাকা ছিল জামদানি শাড়ির পীঠস্থান। তাই এখনও তা ঢাকাই জামদানি নামে পরিচিত। জামদানির ব্যবহার তার দামের কারণে সামান্য কমলেও জৌলুস ছিল বর্তমান। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরার মহারাজা ও অন্যান্য সম্ভ্রান্ত পরিবারের জন্য ঢাকায় জামদানি শাড়ি তৈরী হতো যার তৎকালীন মূল্য ছিল ভারতীয় মুদ্রায় ২০০ টাকা।
বুনন বা কৌশল প্রক্রিয়া:
জামদানি শাড়ি মূলত সাতটি ধাপে তৈরি করা হতো। ধাপগুলি হল:
১. প্রয়োজন অনুসারে জামদানি শাড়ির সুতো রঙ করা হয়। 
২. রঙ করা সুতোকে ধুয়ে, মাড় দিয়ে, লাটাইয়ে পেঁচিয়ে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয়। 
৩. নকশা করার জন্য যে দ্বিতীয় বা তৃতীয় রঙের সুতো ব্যবহার করা হয় তা গুঁটিতে পেঁচিয়ে নেওয়া হয়
৪. সমান তালে হেঁটে জোড়া খুঁটিতে সুতো টান দেওয়া হয়। এই টানা সুতো ৪০ টি থেকে ৫০ টি ববিনে জড়ানো থাকে। যারা এই কাজ করেন তাদের মূলত হাওজাইন্না বলা হয়ে থাকে। 
৫. এর পর ফ্রেমে বসানোর জন্য টানা, শানা ও ভিম তৈরি হলে জামদানি বুননের জন্য প্রস্তুত হয়। 
৬. জামদানি দুজন তাঁতি বুনন করে থাকেন। একজন ওস্তাদ ও আরেকজন সাগরেদ। সাগরেদ ওস্তাদের নির্দেশ পালন করে। ওস্তাদ ভরনার সুতো মাকুর সাহায্যে সাগরেদের দিকে চালান করে। দোপ্তি টেনে কান্ডুর দিয়ে নিঁখুত ভাবে ঘুরিয়ে জামদানির নকশা তৈরি হয়। 
৭. নকশা করার সময় আরেকবার মাড় দেওয়া হয়।
জামদানির প্রকারভেদ:
জামদানি শাড়ি বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে তবে আদি ভাব অনুযায়ী জামদানি শাড়ি ৩ প্রকার
- সিল্ক জামদানি, হাফ সিল্ক জামদানি ও কটন জামদানি।

নকশা:
জামদানি শাড়িতে বিভিন্ন নকশা বর্তমান। যেমন - পান্না হাজার, তেরছা, পানসি, ময়ূরপঙ্খী, বটপাতা , করলা, জাল, বুটিদার, জলপাড়,দুবলি,ডুরিয়া , বলিহার, কটিহার,কলকাপাড় ইত্যাদি।

দাম:
জামদানি শাড়ির দাম মূলত কাউন্টের ওপর ভিত্তি করে হয়। যতো বেশি কাউন্ট, ততো সূক্ষ্ম কাপড়, ততো দামি শাড়ি। ভারতীয় মুদ্রায় এই শাড়ি ৩০০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ১২০০০০ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকতে পারে।
 
                 শাড়ির জগতে জামদানি যোগ করেছে এক নতুন ফ্যাশন সেন্স। কাজেই নিজেকে জামদানির সাজে সাজিয়ে বঙ্গতনয়া রূপে Bong swag নিয়ে ramp এ নামতেই পারেন। দীর্ঘায়িত হোক বাংলার সাধের জামদানি শাড়ি।শাড়ি।

Comments

  1. ❤️ informative

    ReplyDelete
  2. 💗💗💗💗

    ReplyDelete
  3. Ei blogta ektu besi e valo hoyeche ❤

    ReplyDelete
  4. Shundor hoyeche❤

    ReplyDelete
  5. দারুন। বেশ Informative ❤️

    ReplyDelete
  6. Prabuddha Paul4 June 2023 at 21:01

    ❤️👌

    ReplyDelete
  7. দুর্দান্ত 🔥

    ReplyDelete
  8. বেশ informative ❤️

    ReplyDelete
  9. Khub sundor..

    ReplyDelete
  10. চমৎকার লেখা। অনেক কিছু জানতে পারলাম

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

বালুচরী কে বাহবা দেয় জগত, উজ্জ্বল হল বাংলার মুখ

পৈঠানীর তৈরি পান্ডুলিপি, জগৎজোড়া নাম তার

বেনারসির রূপকথা ,রূপকথার বেনারসি