বাংলার সুবাসে তাঁতের তাঁতকাহন

আঁধার এসে উঠোন ঘিরে অট্টহাস্য করে
তাঁতের ধ্বনি মধ্যরাতে সারাটি গ্রাম জুড়ে ।
বাংলার শাড়ির মান জগৎজোড়া।মাটি, জল, বাতাস ও ভালোবাসায় মিলেমিশে একাকার হয় শাড়ির সুবাস। মায়ের দেওয়া সেই মোটা কাপড় মাথায় তুলে নিয়ে বিদেশি দ্রব্য বর্জনের মধ্যেও বারবার উঠে এসেছে বাংলা মায়ের নিজের শাড়ি। বালুচরী, ঢাকাই জামদানি, সুতি, মসলিনের পাশাপাশি আরও যার নাম না বললেই নয়, সেই মাটির সোঁদা গন্ধে মিশে থাকা কাপড় হল তাঁত শাড়ি। তাঁতের শাড়ি বাংলার বহু প্রাচীন কারুশিল্প। দেশভাগের পূর্বে অখণ্ড বাংলা জুড়ে এবং দেশভাগের পরবর্তীতে ওপার বাংলার টাঙ্গাইল ও এপার বাংলার ফুলিয়া(নদীয়া জেলায় অবস্থিত) হয়ে ওঠে তাঁতের পীঠস্থান। কিভাবে জন্ম এই তাঁতের? কিভাবেই বা তা হয়ে ওঠে বাংলার নিজস্ব শাড়ি? কেমন হয় তার বুনন? চলুন জেনে নেওয়া যাক বিস্তারিত। 

জন্ম ও বৃত্তান্ত:
মরক্কোর পর্যটক ইবন বতুতা এবং চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাঙের ভ্রমণ কাহিনী গুলিতে তাঁতশিল্পের বুননের বর্ণনা রয়েছে।গবেষক জেমস টেলারের লেখায় টাঙ্গাইলের, মির্জাপুরের তাঁত বুননের উল্লেখ আছে।আবার অপরদিকে শ্রী অদ্বৈত আচার্যের অদ্বৈতমঙ্গলে শান্তিপুরের তাঁত হস্তশিল্পের উল্লেখ রয়েছে।আনুমানিক ১৪৬০-১৫৫৮ এর সময়ে ,গৌড়ের রাজা গণেশ দানুর সময় থেকে শান্তিপুরে শাড়ির বুনন শুরু হয়।এর থেকে ধারণা করা যায় তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় তাঁত ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় যা পরবর্তীতে এসেও সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক। ইতিহাসের পাতায় কান পাতলে শোনা যায়,সনাতন ধর্মের বসাক সম্প্রদায়ের অধিবাসীবৃন্দ আদিকাল থেকেই তন্তুবায় গোষ্ঠীর মানুষ ছিলেন। আদি বাসস্থান তাদের সিন্ধু উপত্যকায় হলেও পরবর্তীকালে তাঁরা অধুনা পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে চলে আসেন। মুর্শিদাবাদ থেকে রাজশাহী এবং রাজশাহী থেকে অধুনা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ধামরাই তে। এখানে তাঁত বুননের কাজ, কাঁচামাল উৎপাদন ভালো হওয়ায় তা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেগুলিতেও ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই তাঁত শিল্প চলে আসে টাঙ্গাইলে। এবং অধুনা বাংলাদেশ তথা প্রতিবেশী দেশসমূহেও টাঙ্গাইলের তাঁতের বুনন প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে।তার থেকে বচন হয়- "চমচম টমটম গজারির বন,
টাঙ্গাইল শাড়ি তার গরবের ধন।" 

তাঁত শিল্প, এপার ও ওপার বাংলা:
তাঁতের ইতিহাস জানান দিয়ে যায়, বাংলাই হল তাঁতের পীঠস্থান। এপার বাংলা বা পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার ফুলিয়া, শান্তিপুর , হুগলি জেলার ধনিয়া খালি, বাঁকুড়ার সোনামুখী, বিষ্ণুপুর ইন্দপুর, তাল দানা, সিমলাপাল ও পাত্রসায়র ব্লক, মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন অঞ্চল এবং পূর্ব বঙ্গ বা বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার টাঙ্গাইল সদর , দেলদুয়ার, কালিহাতী, নাগরপুর, সখীপুর, ভুঞাপুর, গোপালপুর, বাজিতপুর, সুরুজ, বার্থা, ব্রাহ্মণ কুশিয়া, ঘারিন্দা, গোসাইজোয়াইর, তার টিয়া, চন্ডী, নলুয়া, দেওজান, এনায়েতপুর, বেলতা, গড়াসিন, সন্তোষ, নলসুন্দা, কাগমারী প্রভৃতি তাঁত বুননের প্রসিদ্ধ স্থান।
তাঁত বুননের পদ্ধতি:
একটি মানবচালিত যন্ত্রের মাধ্যমে সুতোর বুননে চলে তাঁত বোনা। যার শ্রুতিমধুর শব্দ গ্রামবাংলার পল্লী গুলিতে এক মেঠো সুর প্রদান করে। 

তাঁতের প্রকারভেদ:
বাংলায় কয়েক প্রকার তাঁত উৎপাদন করা হয়। যেমন- পিট লুম বা গর্ত তাঁত, ফ্রেম লুম, চিত্তরঞ্জন বা জাপানি তাঁত, কোমর তাঁত, হ্যান্ডলুম, পাওয়ার লুম প্রভৃতি। 
নকশা:
তাঁতের শাড়ির বিশেষত্ব হল এর পাড়। ফুল, পাখি ইত্যাদি ছাড়াও ফুটে ওঠে পৌরাণিক কাহিনী। নকশার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল গঙ্গা যমুনা, চাঁদমালা, ভোমরা এবং আরো অনেক কিছু। গঙ্গা যমুনা পাড়ের দুই দিকে দুই রঙের আধিক্য চোখে পড়ে। পাড় গুলি মূলত চকোলেট, তুঁতে ও কালো ও লাল রঙের হয়। চান্দমালা পাড়ে গোলাকার সোনালী বর্ণের নকশা বিদ্যমান। আর গোটা শাড়ি জুড়ে থাকে ছোটো ছোটো গুটি। শাড়ি ভাঁজ করার পদ্ধতি তাই গুটি ভাঁজ নামে পরিচিত। 

দাম:
তাঁতের শাড়ির দাম মূলত ভারতীয় মুদ্রায় ৯৫০ থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। 
 
তাঁত ও জি আই ট্যাগ:
শান্তিপুরি তাঁত বাংলার নিজস্ব সম্পদ। তাই বাংলার নামে আরেকটি জি আই ট্যাগ তাঁতকে কেন্দ্র করেই আসে। 
            কাজেই বাংলার সুবাস তাঁত শাড়ির পরতে পরতে হাতছানি দেয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শাড়ির জগতে তাঁত যুক্ত করেছে এক নতুন ফ্যাশন সেন্স। কাজেই নিজেকে তাঁতের শাড়িতে সাজিয়ে বঙ্গতনয়া রূপে Bong swag নিয়ে ramp এ নেমে পড়তেই পারেন। দীর্ঘায়ু কামনা করি বাংলার সাধের তাঁতের।

Comments

  1. Much Informative ❤️

    ReplyDelete
  2. খুব সুন্দর ❤

    ReplyDelete
  3. ❤️❤️❤️

    ReplyDelete
  4. অনেক তথ্যে সমৃদ্ধ ❤

    ReplyDelete
  5. As usual, khub sundor hoyeche❤️

    ReplyDelete
  6. Very much informative ❤️😊

    ReplyDelete
  7. Shrabanti saha28 May 2023 at 10:19

    Darun ❤️

    ReplyDelete
  8. Very much informative 😄❤️

    ReplyDelete
  9. Good initiative

    ReplyDelete
  10. Informative 🫶🏻

    ReplyDelete
  11. Khub bhalo likhechhis 😊

    ReplyDelete
  12. ভীষন সুন্দর হয়েছে, খুব ভালো লাগলো পড়ে❤️

    ReplyDelete
  13. Suparna Bhattacharjee29 May 2023 at 04:43

    দুর্দান্ত হয়েছে ❤️

    ReplyDelete
  14. Rohan chakraborty29 May 2023 at 05:08

    লেখাটা দারুন হয়েছে পরে খুব ভালো লাগলো ❤️❤️❤️

    ReplyDelete
  15. Khub Sundor 👏❤️👌

    ReplyDelete
  16. Awesome 👏❤️

    ReplyDelete
  17. Bhalo likhechhis ❤️

    ReplyDelete
  18. Khub sundor

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

বালুচরী কে বাহবা দেয় জগত, উজ্জ্বল হল বাংলার মুখ

পৈঠানীর তৈরি পান্ডুলিপি, জগৎজোড়া নাম তার

বেনারসির রূপকথা ,রূপকথার বেনারসি